মাসের বিজ্ঞাপন

 


প্যারিডোলিয়া: উদ্ভট স্থানে মুখের ছবি দেখা

প্যারিডোলিয়া: উদ্ভট স্থানে মুখের ছবি দেখা

লেখাটি ব্যাঙাচি - অক্টোবর ২০২০ (গুজব) -এ প্রকাশিত হয়েছে


১.

রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, হঠাৎ মেঘের দিকে তাকিয়ে যেন অবিকল একটি হাতির শুঁড় দেখতে পেলেন! বাজার থেকে সবজি কিনে এনেছেন, হঠাৎ তার মধ্যে কোনোটিতে চোখে পড়ল মানুষের শরীরের আকৃতি! এমনকি কড়াইতে ডিম ভাজতে গিয়ে দেখলেন সেখানে যেন মানুষের মুখের একটি অবয়ব ফুটে উঠেছে!


এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই আমরা হরহামেশাই। বেশিরভাগ মানুষই এসব ঘটনাকে ‘কাকতালীয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, কেউ কেউ ভাবতে বসেন এর ব্যাখ্যা নিয়ে।


২.

আবেগপ্রবণ বা ভাবপ্রবণ হয়ে এলোমেলো, এলোপাথাড়ি, কাকতালীয় বা অর্থহীন কোনো তথ্য থেকে কোনো অর্থপূর্ণ নিদর্শন খোঁজার প্রবণতাকে বা শুধু অনুভূতির ভিত্তিতে অসংশ্লিষ্ট ও স্বতঃস্ফূর্ত নয় এমন কিছু ঘটনার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বা মিল খুঁজে পাওয়াকে মনোবিজ্ঞানীরা এক ধরনের সাময়িক মনোবৈকল্য বলে ভাবেন।


‘সম্পর্কহীনতার অর্থপূর্ণতা’ খোঁজার এই প্রবণতাকে বলা হয় “অ্যাপোফেনিয়া” (Apophenia)। এটা অনেকটা বাংলা প্রবাদের 'রজ্জুতে সর্পভ্রম’-এর ভ্রমকে সত্য মনে করে রজ্জু বা দড়িকে সাপ ভেবে নেওয়ার মতো। আবার অ্যাপোফেনিয়ারই একটু অংশ, বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় থেকে আমরা যে সকল অর্থপূর্ণ কোনো ইঙ্গিত বের করে ফেলি এবং সেটিই বিশ্বাস করতে শুরু করি, সেই কৌতূহল প্রবণতাকেই বলা হয় 'প্যারিডোলিয়া’ (Pareidolia), যা দুটি গ্রিক শব্দ ‘Para’ (যার অর্থ ‘পরিবর্তিত’) এবং ‘eidolon’ (যার অর্থ ‘আকৃতি বা অবয়ব’) নিয়ে গঠিত।


বিশেষত ছবি বা শব্দ থেকে অস্পষ্ট কোনো নিদর্শনকে স্পষ্ট বলে মনে করা হলো প্যারিডোলিয়া। এতে ভ্রান্তি, বিভ্রম ও ভুল উপলব্ধিকেই সত্য দাবি করার এক ধরনের গোঁয়ারতুমি দেখা যায়।


৩.

এর সহজতম উদাহরণ পাওয়ার জন্য একটি বৃত্ত আঁকুন। তার ভেতর দুইটি ছোটো বিন্দু আঁকুন ও নিচে আড়াআড়িভাবে একটি দাগ দিন। ব্যস, হয়ে গেল ‘মানুষের মুখ’! কোনো ছোটো শিশুকেও যদি মানুষের মুখ আঁকতে বলা হয় সেও সম্ভবত এভাবেই আগে আঁকবে। অথচ সত্যিকার অর্থে এই বৃত্তের সঙ্গে মানুষের চেহারার তেমন কোনো মিল নেই। তারপরও এমন আকৃতি দেখলে মানুষের মুখ ছাড়া আর কোনো কিছুই মাথায় আসবে না।



৪.

আকাশে যখন মেঘের মিলন হয় তখন আমরা খুবই অদ্ভুত একটি কাজ করি। সেটি হচ্ছে মেঘের হাজারো-লক্ষ আকৃতির মাঝে নিজের কল্পনায় আসা আকৃতিটি খুঁজে বেড়ানো। মেঘ-ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো না কোনো অবয়ব খোঁজার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে পেয়েও যাই। মুখের আকৃতি, ঘোড়ার আকৃতি, ড্রাগনের আকৃতি, হাতের ইশারা, কোনো শব্দ, সংখ্যা, প্রতীক, বাংলা অথবা ইংরেজি অক্ষর, মানুষের মুখ, হাসিমুখ, গোমড়া মুখ ইত্যাদি কত কিছুই না মিলিয়ে ফেলি।


মজার বিষয় হচ্ছে যে মাঝে মাঝে অবয়বগুলো এতটাই স্পষ্ট হয়ে যায়, যেন মনে হয় প্রকৃতি সত্যিই আমাদের সাথে মজা করছে। কিন্তু আসলে এগুলো প্রকৃতির সহজাত সৃষ্টি। বলতে পারেন এক ধরনের ধোঁকা!


প্যারিডোলিয়া নিয়ে এযাবৎকালে বৃহত্তম গবেষণা চালাচ্ছে জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান অনফর্ম্যাটিভ। টেক জায়ান্ট গুগলের সহায়তায় ‘গুগল ফেইসেস’ নামে এ গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে গুগল ম্যাপস। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন স্থান খুঁজে যাবতীয় প্রাকৃতিক প্যারিডোলিয়া একত্রিত করা হচ্ছে এর আওতায়। এছাড়াও প্রতিদিন বিশ্বের আনাচেকানাচে আবিষ্কৃত অদ্ভুত সব প্যারিডোলিয়া সংগ্রহে রাখা হচ্ছে। 



৫.

গত বছর একটি চিকেন নাগেটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের মুখাবয়ব ফুটে উঠেছিল, যা পাঁচ হাজার পাউন্ডেরও বেশি দামে নিলামে বিক্রি হয়। বছর দশেক আগে ভারতের ব্যাঙ্গালুরে একটি রুটিতে যিশুর চেহারা দেখা গিয়েছিল, যা দেখতে ওই বছর ব্যাঙ্গালোরে হাজির হয়েছিলেন ২০ হাজারেরও বেশি ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান। পিঠার মধ্যে দেখা গেছে মাদার তেরেসার মুখ। এমনকি কিছুদিন আগে ব্রিটেনের সোয়ানসির একটি সাধারণ বাড়ি সামাজিক মিডিয়ায় আলোড়ন তুলেছিল, যার জানালা-দরজা-ছাদের গঠন দেখে অ্যাডলফ হিটলারের কথাই মনে পড়ে। এছাড়া কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে একটি কেতলিতেও হিটলারের অবয়ব দেখা গিয়েছিল! ১৯৯৪ সালে তো যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী টোস্টে কামড় দিয়ে শিল্পী ম্যাডোনার অবয়ব দেখতে পেয়েছিলেন, যা তিনি সংরক্ষণ করে রাখেন আরও দশ বছর।



৬.

এর বাইরেও গাছপালায়, পাথরে, পাহাড়ে, মাটিতে প্যারিডোলিয়ার প্রচুর নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। পেরুর মার্কাওয়াসিতে মানুষসহ নানা জীবজন্তুর আকৃতির পাথরের অভাব নেই। ফ্রান্সের এবিহেন্স পর্বতমালায়ও মানুষের মুখের আকারের পাহাড়-চূড়া দেখা যায়। স্যাটেলাইট থেকে তোলা সাগর-মহাসাগরের অনেক ছবিতে মানুষ, পশুপাখির ছবি দেখা যায়।


এছাড়া ১৯৭৬ সালে ভাইকিং ওয়ান মহাকাশযান মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠের ছবি তুললে তাতে অবিকল মানুষের মুখাবয়ব দেখা যায়, যা বিজ্ঞানীদের হতভম্ব করে দেয়। মূলত, সে সময় থেকেই তারা জরুরিভাবে প্যারিডোলিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরবর্তীতে পৃথিবীতেও একইভাবে প্যারিডোলিয়ার বিভিন্ন নমুনা খুঁজে পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেন, ব্যাপারগুলো নিছক কাকতালীয় নয়।



৭.

গুগল ফেইসেসের প্রধান সেড্রিক কাইফারের মতে, “প্যারিডোলিয়া এতই আসল যে একে কাকতালীয় পর্যায়ে ফেলার কোনো যুক্তি নেই। এর আরও গূঢ় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে।”


কিন্তু কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? কেনই বা মস্তিষ্ক তুচ্ছ সব জিনিসকে রীতিমতো জ্যান্ত করে চোখের সামনে উপস্থিত করে?



এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী?

হাভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. নুচিন হাজিখানির মতে, "এটি বিবর্তনের ফল। জন্ম থেকেই মানুষ এরকম বিশেষ কিছু প্যাটার্ন শনাক্ত করতে বিশেষভাবে অভ্যস্ত। এসব ক্ষেত্রে নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতাও তেমন কাজে লাগায় না মস্তিষ্ক, অত্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। হোক তা ঠিক বা ভুল।"


সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ফ্রেঞ্চ জানান, "প্যারিডোলিয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে লাখ লাখ বছর আগের প্রাচীন মানুষদের মধ্যে। তাদের বেঁচে থাকার জন্য এটি প্রয়োজনীয় ছিল। প্রতিকূল পরিবেশে থাকার কারণে বিভিন্ন চিহ্ন দেখে তাদের হিংস্র প্রাণী থেকে সতর্ক থাকতে হতো। মাটির কোনো দাগকে বাঘের পায়ের ছাপ মনে হলে দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করতে হতো তাদের। কিংবা কোনো ঝোপঝাড় দেখে হঠাৎ হিংস্র পশু বলে মনে হতো।প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিমত্তা তখনো পরিণত না হওয়ায় এসবকেই তারা বিপদের লক্ষণ বলে ধরে নিত, যার ফলে প্রতি মুহূর্তে আরও সতর্ক থাকতে পারত।"


আবার অনেক গবেষক বলেন যে মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য আদান-প্রদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্যারিডোলিয়া জড়িত। মস্তিষ্ক অনবরত বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন আকার, আকৃতি, রং, প্যাটার্ন তৈরি করতে থাকে, যার সঙ্গে হঠাৎ আশপাশের পরিবেশের কোনো প্যাটার্ন মিলে গেলে প্যারিডোলিয়া তৈরি হয়।


ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নিউরোসায়েন্টিস্ট সোফি স্কটের মতে, "প্যারিডোলিয়ায় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটে।" 


তিনি জানান, "যে ব্যক্তি যে ধরনের চিন্তা বেশি করে, সে সেই ধরনের প্যারিডোলিয়া বেশি দেখে। যে পশুপাখি ভালোবাসে, সে মেঘের মধ্যে হাতি দেখে। যে ধার্মিক, সে টোস্টে যিশুর ছবি দেখে।"


তিনি মনে করেন, এখানে প্রকৃতির কৃতিত্ব যতটা, তার চেয়ে বেশি কৃতিত্ব মানুষের স্বভাব-চরিত্রের।


এছাড়া প্যারিডোলিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি একবার মনে গেঁথে গেলে তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়। যেমন- যে ফলের মধ্যে একবার মানুষের অবয়ব চোখে পড়েছে, প্রতিবার সেই ফলের দিকে তাকালেই সবার আগে মানুষের অবয়বটি চোখে পড়বে। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক সেই ভ্রমকে সত্যি হিসেবে ধরে পাকাপাকিভাবে মস্তিষ্কে বসিয়ে নেয়, যে কারণে চাইলেই কোনো বিশেষ প্যারিডোলিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এর ফলেই প্যারিডোলিয়ার সঙ্গে ধর্ম ও অতিপ্রাকৃতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অসংখ্য প্যারিডোলিয়াকে তাই ধর্মীয় নিদর্শন বা অতিপ্রাকৃত ঘটনার ইঙ্গিত বলে মেনে নিচ্ছেন মানুষজন।



৯.

আসলে এই ধরনের মুখমণ্ডল শনাক্ত করার প্রবণতা মানুষের মস্তিষ্কের কর্টেক্সে খুব দ্রুত পরিবহন করে। এই উদ্দীপনা পরিবহনের ক্ষমতা অন্যান্য উদ্দীপনার চেয়েও দ্রুততর এবং মস্তিষ্কও সেই উদ্দীপনায় খুব দ্রুত সাড়া প্রদান করে। তাই আমরা খুব সহজেই মুখমণ্ডল আকৃতির নয় এমন বস্তুর মধ্যেও মুখমণ্ডল খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।


ম্যাগনেটো এনসেফালোজি পদ্ধতিতে মানুষের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে মানুষের আকৃতি মনে হওয়া ১৬৫ মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তাহলে একটু ভাবুন, কত দ্রুততার সাথে আমরা কল্পনা করে ফেলি!


আমরা তো জানি প্যারিডোলিয়া হচ্ছে অ্যাপোফেনিয়ার একটি অংশ। কিন্তু অ্যাপোফেনিয়ারও কিছু মজার উপাংশ আছে।



যেমন:

Over fitting : যখন কোনো তথ্য মূল গবেষণার পরিবর্তে শুধু বিশেষ কোনো তথ্যকে সন্তুষ্ট করে।


Gambler’s fallacy: জুয়াড়ির হেত্বাভাস যা মূলত তাস, লটারি বা জুয়াতে প্যাটার্ন খোঁজার প্রবণতা।


Hidden meanings: লুক্কায়িত বা প্রচ্ছন্ন অর্থ যেমন : ভাগ্য গণনা, ভবিষ্যদ্বাণী ও জ্যোতিষবিদ্যা, হাত দেখা বা অ্যাস্ট্রোলজিকে সত্য ভাবা।


Confirmation bias: নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত, যাতে ধারণা ও বিশ্বাসকে সত্য ভেবে ও বিপরীত ধারণাকে অগ্রাহ্য করে বিশ্বাস মোতাবেক সমাধান খোঁজা হয়।



Source:

১।

www.livescience.com/25448-pareidolia.html

২।

https://en.wikipedia.org/wiki/Pareidolia



লেখক: আবু রায়হান
ব্যাঙের ছাতার বিজ্ঞান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য